Paschimbanga Divas : ২০ই জুন দিনটি পশ্চিমবঙ্গ প্রতিষ্ঠা দিবস কি ও কেন?

 ২০ই জুন এই ঐতিহাসিক দিনটি পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবস কি ও কেন?

আমাদের এখন প্রয়োজন "পশ্চিমবঙ্গ দিবস" পালন করা কারণ পশ্চিমবঙ্গ কেন গঠিত হল তা পশ্চিমবঙ্গবাসীকে আবার নতুন করে জানানো অত্যন্ত জরুরী। তাই চলুন আমরা সবাই ২০ ই জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করি। #PoschimbongDibos

Paschimbanga Divas  ২০ই জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস
লেখক-বিমল দাস

পশ্চিমবঙ্গ দিবস ? সেটা আবার কি ?

পশ্চিমবঙ্গ দিবস ? সেটা আবার কি ?  এই শব্দবন্ধটি শুনে বর্তমান বঙ্গালি যুব সমাজ হতচকিত হয়ে পরবে। কারন এই শব্দবন্ধটি ইতিপূর্বে কোনো দিন শুনেইনি। না ভুল বললাম , তথাকথিত বাংলার কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবী ও বর্তমানের বুদ্ধিকে জীবিকা করে যারা নিজেদের বুদ্ধিজীবী বলে নিজেদের প্রকাশ করেন তারাই বর্তমান যুবসমাজকে জনতে দেইনি । আজকের দিনটিতেই (২০ই জুন)১৯৪৭ সালে বর্তমান ভারতে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যটির জন্ম হয়েছিল। এক তীব্র মরণপণ সংগ্রাম ও রক্ত স্নানের মাধ্যমে। অত্যন্ত আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলা যায় যে,  যদি এই ভূখণ্ডটি সৃষ্টি না হতো, তাহলে কি হোত? তার জ্বলন্ত উদাহরণ ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্থানে হিন্দু জন সংখ্যা ছিলো  ২৯%  বর্তমানে বাংলা দেশে ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ৮% এসে পৌচেছে। গবেষকদের মতে, আগামীতে এই সংখ্যা শূন্যতে পৌছুতে আর বেশি সময় লাগবে না।

এমত অবস্থায় বাংলার শাসক দল পশ্চিমবঙ্গের নাম থেকে "পশ্চিম" শব্দটি বাদ দেওয়ার জন্য বিধানসভায় একটি বিল পাস করেছে। সেই বিলে সমর্থন জানিয়েছে বাম ও কংগ্রেস। যুক্তি কেন্দ্রে রাজ্যের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় আল্ফা বেট অনুসারে। তাই westbengal এর W একদম শেষের দিকে হওয়ায় আলোচনার সুযোগ কম পাওয়া যায়। আসলে এটা প্রকাশ্য যুক্তি, অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য west শব্দটি বাদ দিয়ে  দেশ ভাগের সময় হিন্দুদের উপর ঘটে যাওয়া নৃশংস অত্যাচারের ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেওয়ার এক গভীর চক্রান্ত। পশ্চিমবঙ্গ নামটা শুনলেই মনে প্রশ্ন আসবে এটা যদি পশ্চিম হয় তাহলে এর পূর্বটা কোথায়? স্বাভাবিক ভাবে উত্তর আসবে বাংলাদেশ । বাংলাদেশ কি ভাবে হলো ? স্বাভাবিক ভাবে উত্তর আসবে দেশ বিভাজনের ইতিহাস।  আর দেশ বিভাজনের ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মকে  ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ থেকে "পশ্চিম" বাদ  দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র। তাই আজ ২০ই জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনের প্রাসঙ্গিকতা ।

  

হিন্দুদের হোমল্যান্ড পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রতিষ্ঠার ইতিকথা:- 


বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড আন্দোলন বলতে বোঝায় যে ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের জন্য বাঙালি হিন্দু জনগণের ভারতীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে নিজের জন্য একটি পৃথক বাসভূমি যা  পশ্চিমবঙ্গ তৈরির আন্দোলনকে বোঝানো হয়েছিল, মুসলিম লীগের প্রস্তাব ছিলো  সমগ্র বঙ্গ প্রদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বঙ্গ, যা ছিল ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের এক রাজ্য l  ১৯৪৬ সালের শেষদিকে এই আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল, বিশেষত কলকাতায় প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ দিবস এবং নোয়াখালী দাঙ্গার পরে, ১৯৪৬  সালের এপ্রিল মাসে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে গতি লাভ করে এবং শেষ পর্যন্ত সাফল্যের সাথে হিন্দু বাঙ্গালী জয়ী হয় ১৯৪৭  সালের ২০ জুন, যখন হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের বিধায়করা তাদের রায় ৫৮/২১ ভোটের ব্যবধানে বঙ্গ বিভাজনের পক্ষে দেন।  

 দাঙ্গার পরে কলকাতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয়েছিল।  পুলিশ মহাপরিদর্শক যখন কলকাতা সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীতে ৫০% বৃদ্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী হুসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জোর দিয়েছিলেন যে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা সবাই পাঞ্জাবী মুসলমান হতে হবে, যার সাথে গভর্নর ফ্রেডরিক বুড়ো সহমত পোষণ করেছিল ।  প্রশিক্ষণের গতি বাড়ানোর জন্য প্রাক্তন সৈনিকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।   যেহেতু উপযুক্ত প্রার্থী বাংলায় পাওয়া যায় নি, তাই পাঞ্জাব থেকে ৬০০ পাঞ্জাবী মুসলমান নিয়োগ করা হয়েছিল।  মুসলিম লীগ সরকার যখন নতুন নিয়োগকারীদের বিশেষ কিছু বেশি  সুবিধা দিয়েছিল, তখন বর্তমান  গুর্খা পুলিশ সদস্যরা এর বিরক্তি বিরোধিতা করেছিলেন এবং প্রাক্তন গুর্খা পুলিশ সদস্যদের সাথে পাঞ্জাবি মুসলিম পুলিশেরা  সশস্ত্র সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিলেন। 

 মুসলিম পুলিশ বাঙালি হিন্দু পরিবারগুলিতে বিনা কারনে মাঝে মধ্যে ঢুকে পরত এবং নারীদের শ্লীলতাহানি করত।  ১২ই এপ্রিল, পুলিশ মানিকতলায় একটি বাঙালি হিন্দু বাড়িতে প্রবেশ করে এবং বাসিন্দাদের মারধর করে।   ছায়ালতা ঘোষ, যিনি সেই সময় গর্ভবতী ছিলেন, গুরুতর আহত হন।  অপর দিকে  ১৪ ই এপ্রিল পুলিশ কর্তৃক অপর এক বাঙালি হিন্দু গৃহবধূকে ধর্ষণ করেছিল ।  হ্যারিসন রোডে একই ধরনের ঘটে যাওয়া এই জাতীয় আরেকটি ঘটনা বেশ কিছু সময়ের জন্য সংবাদের  শিরোনাম হয়েছিল।  কলকাতা দাঙ্গা তদন্ত কমিটি পর্যবেক্ষণ করেছে যে পুলিশ তরুণ বাঙালি হিন্দু ছেলেদের গ্রেপ্তার করত, যাতে প্রমাণ দেওয়ার জন্য কমিটির সামনে হাজির হতে না পারে।  কলকাতার ডেপুটি পুলিশ কমিশনার শামস-উদ-দোহা পরিকল্পিতভাবে হিন্দু যুবকদের গ্রেপ্তার করেছিলেন।  

Poschimbong Dibos Song


 পুলিশি বাড়াবাড়ির সমালোচনা করে সংবাদ পত্রের মন্তব্যে মুসলিম লীগ সরকার সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিয়েছিল।  একটি বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকার হিন্দু মালিকানাধীন মিডিয়া যেমন অমৃতা বাজার পত্রিকা, হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড, আনন্দবাজার পত্রিকার  নিরপেক্ষ  পর্যালোচনার উপর জরিমানা আরোপ করেছিল এবং তাদের সুরক্ষার আধিকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। 

 পূর্ববাংলার কয়েকটি শহরে, বাঙালি হিন্দু মেয়েরা আত্মরক্ষার জন্য, বাঘ নখের মতো ধারালো অস্ত্র বহন করতে শুরু করেছিল,   স্কুলে যাওয়ার সময় মেয়েরা তাদের পোশাকে তা লুকিয়ে রাখত।

 ৫ মার্চ, কিরণ শঙ্কর রায় বাংলার তত্কালীন গভর্নর ফ্রেড্রিক বুড়োর সাথে দেখা করেছিলেন।  গভর্নর  রায়কে সার্বভৌম ও সংহতি পূর্ণ  বাংলার প্রশ্নে বাঙালি হিন্দুদের মতামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে রায় সংক্ষেপে বলেছিলেন যে, মুসলিম লীগ সরকারের প্রতি বাঙালি হিন্দু বিরক্তি এতটাই বেশি ছিল যে তারা এই পদক্ষেপের প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া গড়ে তুলতে পারে?  , মুসলিম লীগ সরকারকে কর দিতে অস্বীকার করে এবং তাদের নিজস্ব সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠা করে। 

 স্যার চান্দুলাল ত্রিবেদী সাহেবের মতে, বাংলার হিন্দুরা একটি স্বাধীন বাংলা চাইত না। যদি না নওয়াখালি হিন্দু নিধন ও গ্রেট কলকাতা কিলিং ঘটত।

 ১৯৪৭ সালের ১লা মে হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ডের একটি কার্টুনে, বঙ্গভঙ্গ সংক্রান্ত বিভিন্ন দাবী দেখায়।  শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভারত বিভাগ না হলেও  সম্ভব হলে বাংলা ভাগের উপর জোর দিয়েছিলেন।

 ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে-এর মতে, কলকাতার দাঙ্গার সময় প্রথমবারের জন্য বঙ্গভঙ্গ দাবি করেছিল বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভা।    ১৯৪৬ সালের শেষের দিকে, বঙ্গ বিভাজনের একটি সংগঠন হিসাবে বিশিষ্ট বাঙালি হিন্দু বুদ্ধিজীবী দ্বারা বেঙ্গল পার্টিশন লিগ গঠন করা হয়েছিল।  তাদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তি হেমন্ত কুমার সরকার, নলিনীক্ষ্য সান্যাল, মেজর জেনারেল এসি চ্যাটার্জি, যাদব পাঞ্জা  , শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিশির কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোধচন্দ্র মিত্র ও শৈলেন্দ্র কুমার ঘোষ।  বেঙ্গল পার্টিশন লিগ পরবর্তীকালে বেঙ্গল প্রাদেশিক সম্মেলন নামে পরিচিতি লাভ করে।   ফেব্রুয়ারিতে, বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভা বাংলার হিন্দুদের জন্য একটি পৃথক প্রদেশ গঠনের জন্য একটি কমিটি গঠন করে এবং তাদের প্রচার শুরু করে জেলাগুলিতে।  ২৯ শে মার্চ, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সভায় বাঙালি হিন্দুদের জন্য পৃথক রাজ্য গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়।  এই পদক্ষেপকে সমর্থনকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বর্ধমানের মহারাজা উদয়চাঁদ মেহতাব, পিএনএন সিনহা রায়, কাসিম বাজারের মহারাজা শ্রীশচন্দ্র নন্দী, মহারাজা প্রবেন্দ্র মোহন ঠাকুর, মহারাজা সীতাংশুকন্ত আচার্য চৌধুরী এবং অমরেন্দ্র নারায়ণ রায় প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ছিলেন।

Read Now

ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে, বঙ্গীয় হিন্দু সভা বাংলার হিন্দুদের জন্য একটি পৃথক প্রদেশ গঠনের জন্য একটি কমিটি গঠন করে এবং জেলাগুলিতে প্রচার শুরু করে।  এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে, তারা তারাকেশ্বরে তিন দিন ব্যাপী বেঙ্গল হিন্দু সম্মেলন আহ্বান করে,  সারা বাংলা থেকে ৪০০ এরও বেশি প্রতিনিধি এবং শেষের দিন ৫০,০০০ এরও বেশি লোক এতে অংশ নেন।  সম্মেলনের প্রথম দিন তাঁর সভাপতির  ভাষণে নির্মল চন্দ্র চ্যাটার্জী বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে অসামান্য অধ্যায় হিসাবে কার্জনের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সফল আন্দোলনের প্রশংসা করেন।  তিনি বলেছিলেন, "উভয় প্রদেশে বঙ্গীয় হিন্দু সংখ্যালঘু করে দেশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করা সর্বশ্রেষ্ঠ জাতীয়তাবাদী শক্তিকে পঙ্গু করার জন্য ব্রিটিশরা এই প্রদেশের বিভক্তির আশ্রয় নিয়েছিল।"  এখন দেশভাগের দাবি করার কারণ,  তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, বাঙালি হিন্দু জাতীয়তাবাদ বজায় রাখা, বাঙালি হিন্দু জনগণের জন্য একটি পৃথক জন্মভূমি তৈরি করা এবং এটি ভারতের অভ্যন্তরে একটি প্রদেশ হিসাবে গঠন করা এবং বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা। তিনি আরও জোর দিয়েছিলেন যে এটি ছিল  বাঙালি হিন্দুদের জীবন বা মৃত্যুর প্রশ্ন।  ৫ই এপ্রিল শ্যামা প্রসাদ তারকেশ্বরে বঙ্গীয় হিন্দু সম্মেলনে বক্তৃতায় বঙ্গভঙ্গকে সাম্প্রদায়িক সমস্যার একমাত্র সমাধান হিসাবে প্রস্তাব করেছিলেন।  সম্মেলনের সমাপ্তির দিন, বঙ্গ হিন্দু সভার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশভাগের প্রস্তাব সনৎ  কুমার রায়চৌধুরী ও সূর্য কুমার বোস উত্থাপন করেছিলেন।  তারকেশ্বরে বেঙ্গল হিন্দু সম্মেলনে রেজুলেশন পাস হয়, শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে বাঙালি হিন্দুদের জন্য পৃথক প্রদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কর্ম পরিষদ গঠনের অনুমতি দিয়েছিলেন।  সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে জুনের শেষ নাগাদ এই লক্ষ্যে ১ লক্ষ স্বেচ্ছাসেবক তালিকাভুক্ত হবে।  গণপরিষদকে প্রদেশ বিভাগের জন্য একটি সীমানা কমিশন নিয়োগের জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। 

৪ এপ্রিল, তারেকেশ্বরে যেদিন বেঙ্গল হিন্দু সম্মেলন চলছে, ঠিক সেদিনই বেঙ্গল কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি বঙ্গভঙ্গ দাবিতে একটি প্রস্তাব পাস করে।  সভায় শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ক্ষিতীশ চন্দ্র নিয়োগি, বিধান চন্দ্র রায়, নলিনী রঞ্জন সরকার, প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবেন্দ্র লাল খান, মাখনলাল সেন এবং অতুল চন্দ্র গুপ্ত প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।  এর পরে, বঙ্গীয় হিন্দু সভা এবং কংগ্রেস তাদের প্রচারকে আরও তীব্র করেছিল।  

শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় আরও স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে বঙ্গভঙ্গের আন্দোলন সরাসরি ভারত বিভাগের সাথে সম্পর্কিত ছিল না।  এমনকি পাকিস্তান তৈরি না হলেও বাঙালি হিন্দু জনগণের সুরক্ষা এবং তাদের সংস্কৃতির জন্য বঙ্গভঙ্গ করা দরকার ছিল।  ২২ এপ্রিল, নয়াদিল্লিতে একটি জনসভায় শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন যে মুসলিম লীগ মন্ত্রিপরিষদ মিশন পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও, বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে একটি পৃথক প্রদেশ গঠন করা দরকার।  পুরো বাংলাকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবির বিরোধিতায়   ২৩ এপ্রিল শ্যামা  প্রসাদ মুখোপাধ্যায় বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট ডেকেছিলেন।  এই ধর্মঘটের শুরুতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থন করেছিল।  পরে ট্রাম ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন সিআইটিইউর অধীনে এই ধর্মঘটকে প্রত্যাখ্যান করার পরিকল্পনা করেছিল।  এই খবর যখন তাঁর কাছে পৌঁছেছিল, শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় নিজেই ট্রাম ডিপো ব্যক্তিগতভাবে গিয়েছিলেন  এবং ট্রাম কর্মীদের সফলভাবে ধর্মঘটের পক্ষে উত্সাহিত করেছিলেন । 



 দীনেশচন্দ্র সিনহার মতে,  কালী কিংকর রায়ের সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রথমবারের মতো সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানের জন্য বঙ্গভঙ্গ করার পরামর্শ দেয়।  এরপরে অধ্যাপক হেমন্ত কুমার সরকার পশ্চিমবঙ্গ একটি পৃথক প্রদেশ গঠনের প্রস্তাব করে একটি বাংলা ভাষার দৈনিক , দৈনিক বসুমতীতে একাধিক নিবন্ধ লিখেছিলেন।  ১৯৪৬ সালের আগস্টে গ্রেট কলকাতা কিলিং এর পরে, দ্য স্টেটসম্যান এবং অমৃতা বাজার পত্রিকার চিঠিপত্রের কলামগুলি এই বিভাগের পক্ষে ও বিপক্ষে লেখকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল।  ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বরে প্রবাসি নামে একটি বাংলা ভাষার সাপ্তাহিক মন্তব্য করেছিল যে, দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পুনর্মিলন এবং সহযোগিতার সম্ভাবনা খুব কম।  বাংলা ভাগের প্রস্তাব বিবেচনার সময় এসেছে।  বাংলা ভাষার সাপ্তাহিক শনিবারের চিঠিটির সম্পাদক সজনীকান্ত দাস উল্লেখ করেছিলেন যে বাঙালি হিন্দু হোমল্যান্ড আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, মেজর জেনারেল দুদক চ্যাটার্জী এবং প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অতএব আশ্বাস দেওয়া যেতে পারে যে তারা কোনও ভাবে এই দাবি ছাড়বেন না।  এটি অর্জন করেই থামবে।  ১৯৪৭ সালের এপ্রিলে সজনীকান্ত দাস শনিবারের চিঠি-তে মতামত দিয়েছিলেন যে এটি বিভাজন করাই সবচেয়ে ভাল।  ২৩ এপ্রিল, অমৃতা বাজার পত্রিকা বাঙ্গালী হিন্দুদের জন্য হোমল্যান্ড শীর্ষক একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল, যেখানে বঙ্গালি হিন্দুদের একটি জনমত সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে অপ্রতিরোধ্য বাঙালি হিন্দুরা বাংলা বিভাজনের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। তারা একটি পৃথক বাঙালি হিন্দু বাস ভূমির পক্ষে । ২৪ এপ্রিল, দ্য স্টেটসম্যান মন্তব্য করেছিলেন যে মুসলিম লীগ সরকারের প্রতি মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে ক্ষোভ এতটাই বেশি ছিল যে রাজ্য ভাগের চেয়ে কম কিছুই তাদের সন্তুষ্ট করতে পারে না।  পরবর্তীকালে অমৃতা বাজার পত্রিকা বাঙালি হিন্দু রাজ্য বাস্তবায়নের জন্য বেঙ্গল পার্টিশন ফান্ড গঠন করে একটি সরকারী তহবিল। 

 ১৫ ই মার্চ, শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় কলকাতায় একটি সভা ডেকেছিলেন, এতে রমেশ চন্দ্র মজুমদার, মাখনলাল রায়চৌধুরী, সুনীতি কুমার চ্যাটার্জী, পণ্ডিত রামশঙ্কর ত্রিপাঠির মতো শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।  সভায় শ্যামা প্রসাদ ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এখন স্পষ্ট যে হিন্দুরা পাকিস্তানে সম্মান ও মর্যাদার সাথে বাঁচতে পারবে না।  সুতরাং, যদি না বাঙালি হিন্দুদের জন্য একটি বাস ভুমি  আদায়  করা না হয় তা  হোলে বঙ্গালি  হিন্দুরা চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পরবে। সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর বক্তৃতায় শ্যামা প্রসাদের পৃথক বাঙালি হিন্দু প্রদেশের প্রস্তাবকে সমর্থন করেছিলেন।  সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়েছিল যে প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত ১০৬ টি প্রস্তাবের মধ্যে কেবল ছয়টি প্রদেশ বিভাগের বিরোধী ছিল, তবে ৯৯.৩৩% বাঙালি হিন্দুদের জন্য পৃথক প্রদেশ জন্মের পক্ষে ছিল।   মেঘনাদ সাহা, যদুনাথ সরকার, রমেশ চন্দ্র মজুমদার ও সুনীতি কুমার চ্যাটার্জির মতো বিশিষ্ট বাঙালি হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা সুরক্ষার ভিত্তিতে বাঙালি হিন্দু জনগণের জন্য পৃথক প্রদেশের দাবি করেছিলেন।  মে মাসে, হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেস উভয় যৌথভাবে রাজ্য ভাগের দাবিতে ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের সভাপতিত্বে একটি বিশাল জনসভা আহ্বান করেছিলেন।

Why Poschimbong Dibos ? Video 


 কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক গণ বাঙালি হিন্দুদের জন্য পৃথক রাজ্যের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেছিলেন।  তা না হোলে  বাঙালি হিন্দুরা কেবল মুসলিমদের  অত্যাচার আর দাসত্বের যাতা কোলের মধ্যে পরবে।  ৫০ জন বিচারক ও ব্যারিস্টার গণ বঙ্গ বিভাগের দাবিতে একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।

  ১ এপ্রিল, বঙ্গ থেকে গণপরিষদের ১১ জন সদস্য এই বিভাগের সমর্থনে ভাইসরয়ের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন।  ২৩ এপ্রিল, শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেনের সাথে দেখা করে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে মন্ত্রিপরিষদ মিশন পরিকল্পনা যদি ব্যর্থ হয় এবং ব্রিটিশ ভারত ভাগ করে, তবে বাংলাকেও ভাগ করা উচিত।  ২৬শে এপ্রিল, কিরণ শঙ্কর রায় এবং বিধান চন্দ্র রায় উভয়ই শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তারা বঙ্গভঙ্গের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে কংগ্রেস কার্যনির্বাহী কমিটিকে রাজি করবে।  ৩রা মে, পূর্ববাংলা থেকে গণপরিষদের দুটি তফসিলি  প্রতিনিধি ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেনের সাথে একটি পার্টিতে সাক্ষাত করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে তফসিলিরা মুসলমানদের বর্বর দমন ও আধিপত্যের অধীনে না যাওয়ার জন্য দৃরপ্রতিজ্ঞ।  তারা   বঙ্গভঙ্গ করার দাবি জানিয়েছিল এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তাবিত বাঙালি হিন্দু মাতৃভূমিতে  পূর্ব বঙ্গের ৭ মিলিয়ন তপশিলী জাতিকে স্থানান্তরিত করার পরামর্শ দিয়েছিল। 

Paschimbanga Divas  ২০ই জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস
পশ্চিমবঙ্গ দিবস 

 ৩০ এপ্রিল কলকাতায় অনুষ্ঠিত চেম্বারস অফ কমার্সের সভা বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন জানিয়েছিল।  জি.ডি.বীরলার মতে, বাংলা বিভাজন কেবলমাত্র অনিবার্য ছিল না, বরং সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানের একটি দুর্দান্ত উপায় ছিল।  মুসলিম মালিকানাধীন ব্যবসায়ীরাও বাংলাকে বিভক্ত করতে চেয়েছিল কারণ তারা টাটা এবং বিড়লাদের সাথে অসম প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চেয়েছিল। 

 ১৯৪৭ সালের ২৮ শে জুন, বাংলার গভর্নর ফ্রেডরিক বুড়ো বাংলায় কংগ্রেস অ্যাসেমব্লী পার্টির নেতা প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষকে পোর্টফোলিও এবং আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক ক্ষমতা ছাড়াই মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানান।  মন্ত্রিসভার মন্ত্রীদের সমস্ত সরকারী কাগজপত্র অ্যাক্সেস করার এবং তার পরে মন্তব্য করার অধিকার থাকবে।  প্রদেশের অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলিকে প্রভাবিত করে এমন কোনও প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তাদের আপত্তি করার অধিকারও থাকবে।  বাঙালি হিন্দু নেতৃত্ব এবং সংবাদমাধ্যমগুলি এই ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছিল কারণ এর অর্থ এই ছিল যে মুসলিম লীগ মন্ত্রক এখনও এই পদে অধিষ্ঠিত থাকবে। ২৯ শে জুন, নয়াদিল্লিতে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ হাই কমান্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে মুসলিম লীগ  সরকার বাংলায় অব্যাহত থাকবে, তবে সীমিত ক্ষমতা দিয়ে তারা কেবল পূর্ব বাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলির জন্য আইন প্রণয়নের সুযোগ দিয়েছিল।  অন্যদিকে, বাংলায় কংগ্রেস বিধানসভা দল পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলি পরিচালনা করতে ছায়া মন্ত্রিসভা মনোনীত করবে তদনুসারে, ২ জুলাই প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ পোর্টফোলিও সহ ১১ সদস্যের মন্ত্রিসভা ঘোষণা করেন।  মন্ত্রিসভায় তফশিলী জাতিগোষ্ঠীর সদস্য হেম চন্দ্র নাসকার, কৃষি, বন ও মৎস্য দফতরের দায়িত্বরত এবং সিভিল সরবরাহের দায়িত্বে থাকা রাধানাথ দাসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। 

Read Now.

 পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠন আন্দলোনের ধারাবাহিক সময় সূচি :-


  1. ১৫ই মার্চ, বেঙ্গল হিন্দু সম্মেলন কলকাতায় অনুষ্ঠিত।
  2.  ২৯ শে মার্চ, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন একটি বাঙালি হিন্দুদের বঙ্গ বিভাজন করে আলদা রাজ্য গঠনের জন্য একটি প্রস্তাব পাস করে।
  3.  ১ এপ্রিল  বঙ্গীয় গণপরিষদের সদস্যরা বঙ্গভঙ্গ দাবি করে ভাইসরয়ের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন।
  4.  ৪ এপ্রিল, তারকেশ্বরে বঙ্গভঙ্গ সম্মেলন অনুষ্ঠিত।
  5.  ২৩ এপ্রিল, বঙ্গভঙ্গের পক্ষে কলকাতায় পরিবহন ধর্মঘট।
  6.  ৪ মে, প্রদেশ বিভাগের জন্য সারা বাংলা জুড়ে এক সাথে ২ হাজার সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
  7.  ৪ ই মে, বিভাজনের  পক্ষে কলকাতায় সম্মেলন।
  8.  ৩ জুন, মাউন্টব্যাটেন বঙ্গ বিভাজনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।
  9.  ২০ জুন, বঙ্গ বিধানসভার হিন্দু বিধায়করা বঙ্গ বিভাগের পক্ষে ৫৮\২১ ভোটে জয়ী হয়েছিল এবং হিন্দুদের হোম ল্যান্ড পশ্চিম বঙ্গের জন্ম হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ দিবস  
২০ ই জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস :পশ্চিমবঙ্গ কেন গঠিত হল তা পশ্চিমবঙ্গবাসীকে আবার নতুন করে জানানো অত্যন্ত জরুরী। তাই চলুন আমরা সবাই ২০ ই জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করি। #PoschimbongDibos
আপনার লেখা মনের লেখা লিখুন আমাদের সাথে The Point বাংলার সাথে। গ্লপ, কবিতা, রাজনীতি , রম্য রচনা, অর্থনীতি, সমাজনীতি , আপানার নিজের লেখা আমাদেরকে পাঠাতে পারেন। শুধু মনে রাখবেন আমরা মুক্ত চিন্তন নয়, দিব্য জ্ঞান নয়- কাণ্ড জ্ঞান চাই।

আমাদের Email ID - thepointbangla@gmail.com
WebSite - https://www.pointbangla.com/

লেখার সাথে আপনার নাম , ফটো , পরিচয় দিয়ে পাঠাবেন। লেখা প্রকাশিত হলে আপনি আমাদের ওয়েবসাইট ফেইসবুক-টুইটার-ইউটিউব এ দেখতে পারবেন।

নবীনতর পূর্বতন