নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর দূর্গা আরাধনা | Netaji Subhash Chandra Bose Maa Durga Puja spiritual life

 নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস ভারতমাতা কে দূর্গা রুপে পূজো করার সমস্ত দায়িত্ব তুলে দেন বিপ্লবী অতীন্দ্রনাথ বসুর ওপর।

Netaji Subhash Chandra Bose Maa Durga Puja spiritual life
Swadeshi-durga-puja-Netaji-Subhash-Chandra-Bose-Maa-Durga Puja-spiritual-life

সাল ১৯২৬ ভারত তখনও স্বাধীন হয় নি, ইংরেজ ব্রিটিশ সরকারের পরাধীনতার শিকলে বাঁধা ছিল ভারতবর্ষের গরিমা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য।সেই সময় ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রভাব তীব্র মাত্রায় আকার ধারণ করেছিল সারাদেশে।প্রচুর বিপ্লবী যুবক অংশগ্রহণ করেছিলেন এই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে।তাঁদের একটাই লক্ষ্য ছিল যেন তেন উপায়ে বিদেশী শক্তির হাত থেকে ভারতমাতাকে রক্ষা করা। তাতে যদি নিজের প্রাণও দিতে হয় তাঁহারা পিছপা হবেন না এবং তাঁরা করেও ছিলেন তাই। একজোট হয়ে সক্রিয় ভাবে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে।

            বিভিন্ন গোপন আস্তানায় চলছে তখন তাঁদের ব্রিটিশ বিরোধী কাজকর্ম। ঠিক তখনই কলকাতাতেও বিপ্লবীদের জোটবদ্ধ করতে একটা কনভেনশনের দরকার ছিল। কিন্তু ব্রিটিশদের চোখে ফাঁকি দিয়ে কলকাতাতে জমায়েত করা কার্যত অসম্ভব। তাই ফন্দি আঁটলেন স্বয়ং সুভাষচন্দ্র বোস।তিনি স্বামী বিবেকানন্দের বাড়ির কাছে সিমলা স্ট্রিটের মহেন্দ্র গোস্বামী লেনে বিপ্লবী অতীন্দ্রনাথ বসুর বাড়ি।তিনি তাঁর বাড়িতে মাঝেমধ্যেই থাকতেন।সেই অতীন্দ্রনাথ বসুর বাড়ির মাঠেই দেবী দুর্গার প্রতিরোধের চেতনা মাথায় রেখে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সার্বজনীন ভাবে মাতৃভূমি অর্থাৎ ভারতমাতাকে দূর্গা রুপে পূজো করার সিদ্ধান্ত নিলেন।কারণ, দূর্গা মূলত শক্তির দেবী।দেবী দুর্গা নির্গুণ অবস্থায় এই জগৎ সংসারে বিরাজ করেন।তাঁর জন্ম হয় না,আবির্ভাব ঘটে। যাকে বলা হয় প্রাকত্ব। দূর্গা সেই মহাশক্তি যে ব্রহ্মার ব্রহ্মত্ব,শিবের শিবত্ব,বিষ্ণুর বিষ্ণুত্ব, প্রদান করেছেন সেই দেবী-দেবতাদের সমষ্টিভূত ত্বেজপুঞ্জ থেকে মহামায়ার সৃষ্টি হয় এবং মহিষাসুর নামক অত্যাচারী অসুরকে বধ করে তিন ধাম, স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালে শান্তি ফিরিয়ে আনেন এবং দশভূজা দূর্গা রুপে পূজিত হন এই ধরাধামে।

১৯২৬ সালের আগে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও ভারতমাতার বন্দনায় ১৮৮২ সালে তাঁর আনন্দমঠ উপন্যাসে "বন্দেমাতরম" গান রচনা করেন।যেখানে ভারতমাতার রুপকে তিনি,

     'ত্বং হি দূর্গা দশপ্রহরণধারিণী
      কমলা কমল-দলবিহারিণী'। 
      
রুপে বর্ণণা করেছেন। এছাড়াও ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতমাকে ত্যাগের প্রতীক গেরুয়া বসনধারী দেবী চতুর্ভুজা লক্ষ্মী রুপে ভারত মাতার চিত্র অঙ্কন করে ছিলেন।যাঁর চারহাতে রয়েছে, তাঁতবস্ত্র, কন্ঠিমালা, পুঁথি ও ধানের শিষ।তাঁতবস্ত্র যা ঐতিহ্যের বার্তা বহন করেন।কুন্ঠিমালা সাধনার প্রতীক।পুঁথি যা অন্ধকারকে দূরীভূত করে শিক্ষায় জ্ঞানের চেতনা উম্মুক্ত করেন। এবং ধানের শিষ যা ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে দু-বেলা অন্নের জোগান দেন।

Netaji Subhash Chandra Bose Maa Durga Puja spiritual life

বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাসের "বন্দেমাতরম" গান যা পরবর্তী কালে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী শক্তির মূল বিজয় মন্ত্র হয়ে উঠেছিল।সকলের কন্ঠে তখন একটাই ধ্বনী " বন্দেমাতরম"।আর সেই বন্দেমাতরম ধ্বনী কন্ঠে ধারণ করে বিপ্লবীরা এগিয়ে গিয়েছিল ইংরেজ ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে।এবং অতীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ভারতমাতার চিত্রটি পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল স্তম্ভ হয়েছিল।কারণ নেতাজী যাঁর আদর্শকে নিজের স্ব-শরীরে বহন করে, যাঁর দেখানো পথকে পাথেয় করে নিজেকে চালিত করেছেন এবং ছোটোর থেকে রাষ্ট্র ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে ছিলেন।সেই আদর্শের মহান যুগাবতার স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৭ সালে সমগ্ৰ ভারতবাসীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ' আগামী পঞ্চাশ বছর যেন আমাদের একমাত্র আরাধ্য দেবতা ভারতমাতা হন'।তাই তো,১৮৯৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর সমগ্ৰ ভারতবাসী দেবতা জ্ঞানে ভারত মাতাকে একমাত্র মাতৃদেবতা রুপে পূজো করে ব্রিটিশ ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতার বিজয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন ভারতের মাটিতে।আমাদের দেশ ভারতবর্ষ এমনি-এমনি চরকা চালিয়ে স্বাধীন হয় নি,এর জন্য কত সহস্র নারায়ণী সেনা 'বন্দেমাতরম' ধ্বনীকে কন্ঠে ধারণ করে হাসি মুখে তাঁদের জীবন আহুতি দিয়েছেন মাতৃভূমি ভারতমাতার রক্ষায়।

Netaji-Subhash-Chandra-Bose-Maa-Durga Puja-spiritual-life


এই ধ্বনির তীব্র প্রতিক্রিয়ায় ভীত হয়ে একবার ব্রিটিশ সরকার জনসমক্ষে এই ধ্বনি উচ্চারণ নিষিদ্ধ করে দেয়।এই সময় বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী "বন্দেমাতরম" ধ্বনি দেওয়ার অপরাধে গ্রেফতার হয়েছিলেন।

তাই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস ভারতমাতা কে দূর্গা রুপে পূজো করার সমস্ত দায়িত্ব তুলে দেন বিপ্লবী অতীন্দ্রনাথ বসুর ওপর।নেতাজীর নির্দেশে পূজোর আয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়েন অতীন্দ্রনাথ বসু।বাড়ি-বাড়ি ঘুরে আদায় করা হয় চাঁদা। তখনকার দিনে চাঁদা আদায় করে পূজো করার ব্যাপারটাতে একটা নতুনত্ব ছিল।কারণ তখনকার দিনে একশ্রেণীর জমিদার বাড়ির পূজো ও বারোয়ারী পূজোর প্রথা ছিল। যেখানে সর্বসাধারণের যাওয়া প্রায় নিষিদ্ধ ছিল।

Netaji-Subhash-Chandra-Bose-Maa-Durga Puja-spiritual-life
Netaji Subhash Chandra Bose Maa Durga Puja spiritual life


সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী অতীন্দ্রনাথ বসুর হাত ধরেই প্রথম কোলকাতার সিমলাতে সার্বজনীন দূর্গোৎসবের সূচনা হয়। অতীন্দ্রনাথ বসুর সিমলার বাড়িতে বিপ্লবীদের জন্য শরীর চর্চার সমস্ত রকম কলাকৌশল শেখানোর অনুশীলনের ব্যাবস্থা করেন সুভাষচন্দ্র বোস।যা পরবর্তী কালে সিমলা ব্যয়াম সমিতি নামে পরিচিত। এভাবেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জমায়েতও সহজলভ্য হয়ে উঠেছিল।সাথে দেশমাতৃকার জন্য মাতৃ আরাধনা করাও সম্ভব হত। ইংরেজ সরকার যখন বুঝতে পেরেছিল তাঁদের বিরুদ্ধে বিপ্লবীরা ঘোর ষড়যন্ত্র করছে।সেই দিন থেকে বিপ্লবীদের আখড়া হিসেবে ইংরেজ শাসকরা সিমলা ব্যায়াম সমিতির ওপর নজর রাখত। সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে কলকাতার সিমলার ব্যায়াম সমিতিতে সর্বপ্রথম দুর্গা পুজো সার্বজনীন ভাবে পালিত হয়।তাই ব্রিটিশ সরকার এই পূজোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।দু'বছর পরে তা উঠে যায়।এভাবেই কলকাতার বুকে সার্বজনীন দূর্গোৎসবের সূচনা করেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস। কিন্তু আজ দেখতে গেলে, যিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জাতিভেদ প্রথার ঊর্ধ্বে উঠে সকলের জন্য দূর্গা পূজোর শুভারম্ভ করলেন ভারত মাতাকে বিদেশী শক্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য, সেই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস ভারতবাসীর চোখে আজ রহস্যময় এক অধ্যায় হয়ে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলেন। তাই দেবী দুর্গার কাছে আমার একটাই প্রার্থনা, 'দশভূজা তুমি ভারত জননী ত্রিশুল ধরো আবার'।যাতে নিজের সন্তানের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে দশহাতে ত্রিশুল নিয়ে নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্য ভেদ করে ভারতবাসীর জনসমক্ষে দেখিয়ে দাও তোমার অপার শক্তি।যাতে আমরা নির্ভয়ে বলতে পারি, 'পূর্ব গগনে অরুণ-দীপ্তি, ফুটিছে নতুন ভোর।/ ঐক্যবদ্ধ হিন্দু বিশ্বে, কেটে যাবে ঘন ঘোর।/এ ভারত হবে বিশ্ব জননী প্রত্যয় সবাকার,অন্তরে অনিবার'।


লেখক
কৌশিক দাস
                                                        ইমেল : dkoushik1991@gmail.com

আপনার লেখা মনের লেখা লিখুন আমাদের সাথে The Point বাংলার সাথে। গ্লপ, কবিতা, রাজনীতি , রম্য রচনা, অর্থনীতি, সমাজনীতি , আপানার নিজের লেখা আমাদেরকে পাঠাতে পারেন। শুধু মনে রাখবেন আমরা মুক্ত চিন্তন নয়, দিব্য জ্ঞান নয়- কাণ্ড জ্ঞান চাই।
আমাদের Email ID - thepointbangla@gmail.com

WebSite - https://www.pointbangla.com/
লেখার সাথে আপনার নাম , ফটো , পরিচয় দিয়ে পাঠাবেন। লেখা প্রকাশিত হলে আপনি আমাদের ওয়েবসাইট ফেইসবুক-টুইটার-ইউটিউব এ দেখতে পারবেন।


নবীনতর পূর্বতন