শুভ মহালয়া বলতে নেই কেন ? subho mahalaya in bengali

 মহালয়া (subho mahalaya) কখোনই শুভ হয় না  কেন ?


subho mahalaya in bengali
subho mahalaya in bengali

চন্দ্রচূড় জানাচ্ছে যে:- শুভ মহালয়া (subho mahalaya) বলতে নেই

সত্যিই তো, আমরা কত কম জানি!

মহালয়ার দিন সকালে --

জনৈক প্রতিবেশি :- ও দাদা, নমস্কার, শুভ মহালয়া। 

আমি :- মানে? 

প্রতিবেশি - মানে আবার কি, পূজো শুরু হয়ে গেল তাই বললাম। 

আমি - মানে ? 

প্রতিবেশি - দূর মশাই, এর আবার মানে মানে কি? 

আমি - মানে, জানতে চাইছি, মহালয়ার সঙ্গে পূজোর কী সম্পর্ক? 

প্রতিবেশি - এ তো আচ্ছা ক্ষ্যাপা লোক! মহালয়া মানেই তো দেবীর আগমনের শুরু, পূজো শুরু। এই যে দেখুন, মা দুর্গার মুখের ছবি দিয়ে 'শুভ মহালয়া' লিখে কত মেসেজ আসছে সারা দিন ধরে। 

আমি - শুনুন, মহালয়ার  (mahalaya) সঙ্গে দুর্গাপূজোর আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। যারা মা দুর্গা'র ছবির সঙ্গে 'মহালয়া' লিখছে তারা নিজেরাও জানেনা কত বড় ভুল করছে।

- যাঃ বাব্বা....!  বলে কি, এতো সবজান্তা দেখছি।

- সবজান্তা নই, তবে এটুকু জানি যে, দুর্গাপূজোর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। 

- বললেই হলো নেই ? সকালে রেডিওতে মহালয়া শোনেন না আপনি? 

- ওটা মহালয়া নয়। ওটা "মহিষাসুরমর্দিনী"  নামের একটি অনুষ্ঠান। এর সঙ্গেও মহালয়া'র কোনো সম্পর্ক নেই। এই দিনে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার হয়, এই পর্যন্তই।

- তাহলে মহালয়াটা কি ঘোড়ার ডিম, খায়, না মাখে? 

মহালয়া (mahalaya) কথার অর্থ  

-   মহালয়া (mahalaya) কথাটি এসেছে 'মহত্‍ আলয়' থেকে। হিন্দু ধর্মে মনে করা হয় যে পিতৃপুরুষেরা এই সময়ে পরলোক থেকে ইহলোকে আসেন জল ও পিণ্ডলাভের আশায়।প্রয়াত পিতৃপুরুষদের জল-পিণ্ড প্রদান করে তাঁদের 'তৃপ্ত' করা হয়। 

- সে তো জানি। গঙ্গার ঘাটে-ঘাটে মন্ত্র-টন্ত্র বলে। তাতে কী হল? পুজোর আগে জলটল দিয়ে শুদ্ধ করা হল না ? 

- শুদ্ধ, অশুদ্ধের ব্যাপার নয়। এর সঙ্গে মহাভারতের যোগ আছে।

- কেলো করেছে। এখানেও মহাভারত? 

- আজ্ঞে হ্যাঁ। জেনে রাখুন - মৃত্যুর পর কর্ণের আত্মা পরলোকে গমন করলে তাঁকে খাদ্য হিসেবে স্বর্ণ ও রত্ন দেওয়া হয়েছিলো। কর্ণ এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তাঁকে বলা হয়, তিনি সারা জীবন স্বর্ণ ও রত্ন দান করেছেন, কিন্তু প্রয়াত পিতৃগণের উদ্দেশ্যে কখনও খাদ্য বা পানীয় দান করেননি। তাই স্বর্গে খাদ্য হিসেবে তাঁকে সোনাই দেওয়া হয়েছে। বিমর্ষ কর্ণ বলেন, তাঁর পিতৃপুরুষ কারা সেটা তো তিনি মৃত্যুর মাত্র একদিন আগেই জানতে পেরেছেন। তার দোষ কোথায়! যমরাজ তখন বোঝেন, সত্যিই তো, এতে কর্ণের কোনো দোষ নেই। এই কারণে কর্ণকে পক্ষকালের জন্য ফের মর্ত্যে ফিরে পিতৃলোকের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল প্রদান করার অনুমতি দেওয়া হয়! এই পক্ষই পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত হয়। আর সেই থেকেই হিন্দুদের মধ্যে তর্পণের প্রথা চালু হয়। 

-  এ তো হেব্বি ক্যাঁচাল। এত সব তো জানতাম না। 

- আরো শুনে রাখুন, পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মের তিথি হিসেবে নির্দিষ্ট হওয়ায় একে 'শুভ' বলতে নেই। 

- সে কি! শুভ মহালয়া বলবো না তাহলে? 

- না, বলবেন না। আপনার প্রিয়জনের  শ্রাদ্ধের দিন কেউ যদি আপনাকে 'হ্যাপি আপনার  বাপ-ঠাকুদ্দার শ্রাদ্ধ' বা 'শুভ শ্রাদ্ধ' বলে, আপনার কেমন লাগবে? 

- হেব্বি মাথা গরম হয়ে যাবে। কিন্তু আমি তো না বুঝেই বলেছি। 

আমি - এমন না বুঝেই তো আমরা কতকিছু বলি। এবার বুঝলেন তো? এর পর থেকে এই দিনটিতে আর "শুভ মহালয়া" বলবেন না। 

প্রতিবেশি - বুঝলাম, তবে অভ্যাস বড় বালাই। এতদিনের অভ্যাস কি সহজে যাবে? আমরা হলাম গিয়ে 'কমন পাবলিক'। লোকে বলে, তাই বলি। তা আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগলো। আপনি ভালো থাকবেন। 'শুভ মহালয়া' দাদা। চলি এবার।

আমি হাঁ করে তাঁর গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সত্যিই "বুঝাইলে বুঝে না -- সোনা মুখের বায়না"। 

আপনারা, যাঁরা এই লেখাটা পড়লেন, আশা করব যে, তাঁরা অন্ততঃ আর "শুভ মহালয়া" বলবেন না।

কাজেই মহালয়া হল মানুষের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করার দিন।

তাকে wish করে শুভেচ্ছা জানানোর কোনও কারণ থাকতে পারে না।

কিন্তু মোবাইলধারী জনগণ sms-এর মাধ্যমে এবং Facebook accountওয়ালারা wallএ wallএ মহালয়ার শুভেচ্ছাবার্তা দিয়ে এটা করে থাকেন।

এই ভুল ধারণার প্রধান কারণ হল— মহালয়ার ভোরে আকাশবাণীর মহিষাসুরমর্দিনী গীতিআলেখ্য প্রচার।

১৩৩৯ বঙ্গাব্দের (১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ) আশ্বিন মাস। দুর্গাপুজোর মহাষষ্ঠীর ভোরে তৎকালীন ‘ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং সার্ভিস’ নামে খ্যাত কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে সম্প্রচার হল এক অভিনব আগমনী গীতি-আলেখ্য ‘মহিষাসুরমর্দিনী। রচনা— বাণীকুমার, সুর সংযোজনা:— পণ্ডিত হরিশচন্দ্র, রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। স্ত্রোত্র পাঠ:— বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।


বেতার সম্প্রচারের ছিয়াশি বছরের ইতিহাসে এই রকম অনুষ্ঠান আর দ্বিতীয় নির্মিত হয়নি, যার জনপ্রিয়তা এর ধারেকাছে আসতে পারে।

১৯৭৬-এ একবার, মাত্র একবারই মহালয়ার ভোরে বেজে উঠেছিল এক নতুন গীতি-আলেখ্য, কিন্তু সে পরিবর্তন বাঙালি মেনে নেয়নি। প্রত্যাখ্যানের সুর এতটাই চড়া ছিল যে বাদ পড়েননি বাঙালির ‘ম্যাটিনি আইডল’— উত্তমকুমার


যিনি ছিলেন ওই অনুষ্ঠানের গ্রন্থক।

সেই ‘জরুরী অবস্থা’-র জমানাতেও জনগণের প্রবল প্রতিবাদে মহাষ্ঠীর সকালে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সম্প্রচার করতে বাধ্য হয়েছিল সরকারি প্রচার মাধ্যম ‘আকাশবাণী’।

প্রথম বছর অর্থাৎ, ১৯৩২-এ দুর্গাষষ্ঠীর ভোরে সম্প্রচারিত হলেও পরের বছর থেকে তা মহালয়ার ভোরে সরিয়ে আনা হয় একটাই কারণে যে, মানুষজন ওই অনুষ্ঠান শোনার জন্য ভোরে ঘুম থেকে উঠবেন এবং তার পর তর্পণ করতে বেরোবেন।

মহালয়া পিতৃপুরুষকে জলদান করার তিথি—এর সঙ্গে দুর্গাপুজোর কোনও যোগ নেই—যোগ নেই মহিষাসুরমর্দিনী’ গীতিআলেখ্যটিরও। এটা নেহাতই morning alarm হিসেবে এটি সম্প্রচার করা হয়ে থাকে।

অতএব—

হালয়া উপলক্ষে একে অপরকে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠানোর কোনও প্রয়োজন আছে কি?


আপনার লেখা মনের লেখা লিখুন আমাদের সাথে The Point বাংলার সাথে। গ্লপ, কবিতা, রাজনীতি , রম্য রচনা, অর্থনীতি, সমাজনীতি , আপানার নিজের লেখা আমাদেরকে পাঠাতে পারেন। শুধু মনে রাখবেন আমরা মুক্ত চিন্তন নয়, দিব্য জ্ঞান নয়- কাণ্ড জ্ঞান চাই।
আমাদের Email ID - thepointbangla@gmail.com

WebSite - https://www.pointbangla.com/
লেখার সাথে আপনার নাম , ফটো , পরিচয় দিয়ে পাঠাবেন। লেখা প্রকাশিত হলে আপনি আমাদের ওয়েবসাইট ফেইসবুক-টুইটার-ইউটিউব এ দেখতে পারবেন।

নবীনতর পূর্বতন