"নারী শিক্ষা ভান্ডার" - এর এবং নারী শিক্ষা প্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর অবদান । Nari Siksha Bhandar

নারী শিক্ষা ভান্ডার-এর নারীমুক্তির শিক্ষা ক্ষেত্রে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান

ভূমিকা :- "নারী শিক্ষা ভান্ডার" (Nari Siksha Bhandar) শতশত আলোক বর্ষদুরের দীপ্যমান জ্যোতিষ্ক গুলির অনুরূপ নারী শিক্ষা প্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর অবদান ক্ষেত্রটিকে আলোকিত করেছে। তিনি বুঝেছিলেন দেশকে উন্নত করতে, সমাজকে উন্নত করে অবশ্যই প্রকৃত শিক্ষার প্রয়োজন যা মানুষের অন্ধকার থেকে আলোর পথে আসার পথ দেখাবে। ১৮৫০ সালের ৫ই ডিসেম্বর তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ রূপে নিযুক্ত হন। এর পর থেকেই তাঁর শিক্ষাসংস্কারের কাজ শুরু হয়। -দেবপ্রিতা পাল

নারী শিক্ষা ভান্ডার  এর এবং নারী শিক্ষা প্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর অবদান ishwar chandra vidyasagar in women's education in bengali
নারী শিক্ষা ভান্ডার  ishwar chandra vidyasagar in women's education in bengali

সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপক্ররূপে নিযুক্ত হওয়ার সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর ঘটে যাওয়া ঘটনা :- 

Nari Siksha Bhandar ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বন্ধু তথ্য ব্যবসায়ী পার্টনার মদনমোহন তর্কালঙ্কার যখন অধ্যাপনার কাজ ছেড়ে জাজের চাকুরি নিয়ে চলে যান তখন তাকে অধ্যাপক হিসেবে ডাক দেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর তাঁর শিক্ষা সংস্কারের দিকটি জানালে তাঁকে যদি অতিরিক্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয় তবেই তিনি একাজ করবেন। সুতরাং তাঁর দাবি মেনে নিয়ে তাকে ১৮৫০ সালের ৫ই ডিসেম্বর অধ্যক্ষরূপে নিযুক্ত করা হয়। এরপর তিনি ১৬ই ডিসেম্বর তার শিক্ষাসংস্কার বিষয়ক একটি রিপোর্ট পেশ করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তার স্বাধীন কার্যকলাপ মেনে নিতে না পেরে রসময় দত্ত বিরোধীতা করলে তিনি পদত্যাগ করেন।

শিক্ষাসংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৮৫৭ সালের ১৬ই ডিসেম্বরে পেশ করা রিপোর্টের সংক্ষিপ্তসার -

 nari shiksha bhandar ki sthapna karen : ১৮৫৭ সালের রিপোর্ট সংক্ষিপ্তসার বিচার করে গোপাল হালদার বলছেন তা ২৫টি প্যারা বা অনুচ্ছেদে বিভক্ত ছিল প্রথম ৫টি ছিল মূল উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে এবং পরের ২১ টি ছিল শিক্ষার ভার এবং শিক্ষার উন্নতির বিষয় নিয়ে। ৬ থেকে ১৭টি প্যারা ছিল শিক্ষার ভার নিয়ে। ১৮ ও ১৯ ছিল শিক্ষা পদ্ধতি এবং ২০ থেকে ২৫ প্যারায় ছিল শিক্ষা পরিকাঠামো নিয়ে এবং ২৬ প্যারায় ছিল শিক্ষা সংস্কার নিয়ে। শিক্ষা সংস্কারের বিষয় গুলি হল ---

  1. একঃ পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে তা যেন হয় এক সমৃদ্ধ শিক্ষা।
  2. দুই: ইউরোপীয় আকার থেকে জ্ঞান বিজ্ঞান আহরণে অক্ষম হলে, তা বাঞ্ছনীয় নয়। তিন : ইংরেজি ভাষায় জ্ঞান থাকা শিক্ষকদের অবশ্যই সংস্কৃতের ছোঁয়া থাকতে হবে এবং উল্টোদিকে সংস্কৃত ভাষায় দক্ষ শিক্ষককে ইংরেজির চর্চা রাখতে হবে।
  3. চার : সংস্কৃত ভাষার উপর দুর্বল এমন শিক্ষক নিয়োগ বোধহয় সঠিক না। কারণ তাদের কিছুদিন সংস্কৃত শিক্ষা দিলেও তারা তা শিখে উঠতে নারাজ।
  4. পাঁচ : শিক্ষার্থীদের প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করলেই তারা পরবর্তী কালে সমৃদ্ধ এবং দক্ষ সাহিত্যের রচয়িতা হবেন।


শিক্ষা ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের ভাবনা :- 

নারীমুক্তির ক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান বুঝেছিলেন দেশকে উন্নত করতে হবে। শিক্ষার অবশ্যই প্রয়োজন, সাথে তিনি এই বিষয়টি অনুধাবন করেছিলেন যে দেশীয় মানুষের কাছে সেই শিক্ষা যদি তাদের মাতৃভাষায় সহজ সরল ভাবে তুলে ধরা হয়, তবে তা উপযুক্ত কাজ একই সাথে তিনি এও চিন্তা করে যে প্রাচ্য পাশ্চাত্যের শিক্ষার মাধ্যমে ছাত্ররা আরও দক্ষ এবং মুক্তিবাদী মানসিকতার অধিকারী হবে, তাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বলেন 

  1. প্রথমত:-- শিক্ষা হবে সত্যই সংস্কৃত সাহিত্য।
  2. দ্বিতীয়ত:- বাংলা সাহিত্যের জ্ঞান সমৃদ্ধ। 
  3. তৃতীয়ত:- প্রয়োজন মাফিক ইংরেজি শিক্ষা।

শিক্ষার পরিকাঠামোর উন্নতির জন্য বিদ্যাসাগরের কিছু পদক্ষেপ-

শিক্ষাকে আরও সহজ এবং বোধগম্য করে তোলার বিদ্যাসাগর আভ্যন্তরীণ শিক্ষা পরিকাঠামোতে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন-

তিনি পাঁচ থেকে চার বছরে নামিয়ে আনেন ধাতু পদ, অর্থ্যাকোষ ইত্যাদি।
দর্শন থেকে দেন কিছু অপ্রয়োজনীয় কঠিন বিষয়।
ভাষায় লেখা গণিতের সর্বোৎকৃষ্ট বই গুলিকে অনুকরণ করে বাংলায় বই লেখার পরামর্শ দেন; বহু বাংলা ইস্কুলের সাহায্যে আসে।
তিনি বোঝেন ইংরেজি সংস্কৃত ভাষা শেখার কাটছাঁট করে বানিয়ে এনে সেই সময়টা ইংরেজি শেখাতে করেন।
শিক্ষার উন্নতির জন্য তিনি কিছু নিজে অনুবাদ করার দায়িত্ব নেন– ব্যাকরণ কৌমুদি (১৮৫৪-৫), অজুপাঠ (১৮৫০)।


শিক্ষার পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগর গৃহিত কিন্তু প্রশাসনিক পদক্ষেপ-

অমদেশ ত্রিপাঠি বলেছেন, আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেই পদক্ষেপ করেন তিনি শিক্ষার ক্ষেত্রে বাহ্যিক দিকটিও সুচারু গড়ে তুলেছিলেন।

  • একঃ- শিক্ষকদের সঠিক হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ ক্লাসের সময় চেয়ারে বসে একটু ফুলে যাওয়া ছাত্রদের দিয়ে পাখা একদম তিনি ক্লাসের ব্যবস্থা করে। আট করে ক্লাস প্রতি রবিবার বিদ্যালয় বন্ধ থাকবে।
  • তিনহ-পাশ প্রথা শুরু করেন। ক্লাস থেকে বেরোনোর জন্য নির্দিষ্ট লাগবে।
  • চার- স্কুলফুট করার জন্য অ্যাডমিশন শুরু হয়। যাতে অভিভাবকরা সজাগ নজর রাখতে পারে তানো সন্তানদের প্রতিনিয়ত বিদ্যালয় যাওয়ার উপর।
  • ব্যক্তিগত বিষয়ে কিন্তু কোনো শিক্ষক ভালো পড়াতেন, কিন্তু ছাত্ররা তাঁকে উত্যক্ত করত সহ্য করতেন না।
  • তিনি ছাত্রদের লাঠি মারা বা বেত মারার মতো কোনো কাজ তিনি করেন নি , কিন্তু  চরম অপরাধ দেখলে তিনি গোটা ক্লাসকে শাস্তি  দিতেও পিছ পা হতেন না।
  • সাতঃ ক্লাসের শেষে তিনি ছাত্রদের সাথে বন্ধুর মতো মিশতেন এমনকি ময়দানে কুস্তির আখড়া তৈরী করে তিনি নিজেও ছাত্রদের সাথে কুস্তি লড়তেন।

বিদ্যাসাগরের চিন্তাভাবনার নামাজিক দিক ঠাকুর তাঁর উদ্দেশ্যে বলেছেন।

 “বিদ্যাসাগরই হলেন তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থার এক যোগাতম শিল্পী"।।


বিদ্যাসাগরের প্রয়াসে বিদ্যালয় যখন একটি যৌথ পরিবার :- 

বিদ্যাসাগরের শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নত চিন্তাধারা বিদ্যালয়কে একটি পরিবার সূত্রে বেঁধেছিল। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে পড়াশোনা কে সঠিক ভাবে করার জন্য পঠন-পাঠনের উন্নতির সাথে শারীরিক সুস্থতা, মানসিক শান্তিরও প্রয়োজন। তাই তিনি ছাত্রদের জন্য ক্লাসের মাঝে মাঝে জলপানির ব্যবস্থা করেছিলেন। মেঝের মধ্যে কার্পেটে বাসে, ভরা পেট খেয়ে এসে তাদের মধ্যে যাতে আলসেমি না আসে তার জন্য তিনি চেয়ার টেবিলে পড়ার ব্যবস্থা করেন। পড়াশোনা বিষয়টির যাতে ছাত্ররা গুরুত্বের সাথে নেয় তার জন্য তিনি মাসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা শুরু করেন। পড়াশোনা যাতে ছাত্রদের মধ্যে এক ঘেঁয়েমি না হয়ে ওঠে তাই তিনি পড়ার ফাঁকে কুক্তি, জিমানস্টিক সহ বিভিন্ন খেলার আয়োজন করতেন।

বর্তমান সমাজে শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে বিদ্যাসাগরের শিক্ষা চিন্তার মিল:-

ছাত্রদের কাছে পড়াশোনাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার জন্য তিনি সেমিস্টার প্রথা আরম্ভ করে, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যা প্রমাণ করে তিনি কতটা আধুনিক ভাবে শিক্ষাব্যবস্থা সাজাতে চেয়েছিলেন। এছাড়া ক্ষেত্রে তিনি যে সমস্ত নিয়মের ব্যবস্থা করেন তা আজও বহু বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক।


ভারতের নারী শিক্ষা বিস্তারে বিদ্যাসাগরের অবদান :- 

নারীমুক্তির ক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান: বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন "নারী প্রগতি সমাজের অগ্রগতি” তাই তিনি নারীদের পড়াশোনার বিষয়েও অনেক উৎসাহ দিয়েছিলেন। তিনি প্রাথমিক ভাবে ১৮৫৪ সালে গ্রামে গ্রামে অনেক মডেল স্কুল স্থাপন করেছিলেন। ৪০টির মতো বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন তিনি। সেখানে মেয়ে পড়ুয়ার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৪৮ জন। ৭ মাসের মধ্যে (নভে: ১৮৫৭ সালে জুন ১৮৫৮ সাল)। কিছু সরকারী সাহায্য না পাওয়ায় তিনি ব্যক্তিগত ভাবে সেই খরচ চালায়। পরে দেখা যায় তার নিজস্ব ঋণের বোঝা হয়ে দাঁড়ায় টাকার অঙ্কে অর্থাৎ ৩৯৩১ টাকা এ আনা ৩ পয়সা। পরবর্তীকালে ১৪ অক্টোবরে চিঠি পড়ে সরকার বিদ্যাসাগরকে ব্যক্তিগত ঋণ মেটানোর বন্দোবস্ত করার কথা বলেন। নারীমুক্তির ক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারী শিক্ষা ভান্ডার কে স্থাপন করেন। এই নারী শিক্ষা ভান্ডার কে প্রতিষ্ঠা করেন কারণ নারীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে আর্থিকভাবে একটি ব্যবস্থা করে দেওয়া। নারী শিক্ষা ভান্ডার (nari shiksha bhandar ) থেকে অর্থ নিয়ে বাংলার নারীরা শিক্ষা নিতে পারবে। অমলেশ ত্রিপাঠী এ প্রসঙ্গে বলেন যে, নির্মানের সাথে স্ত্রীশিক্ষা প্রসার শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত মিউ মিউ শব্দে পরিণত হয়।

শিক্ষা ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের অবদান : 

শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের অবদান এককথায় অনস্বীকার্য। যা আজও আমাদের শিক্ষাকে সমৃদ্ধশালী করে। যতি চিহ্নের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে বিদ্যাসাগর আমাদের ধারণ নিয়েছেন। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান বর্ণপরিচয়, যা শিক্ষার একটি প্রাথমিক ধাপ। এছাড়া তাঁর লেখা জীবন চরিত, চরিতাবলী আমাদের সঠিক ভাবে জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রকে শুষ্ক করেছে। তাই বলা যায় বিদ্যাসাগর-ই হল- উনবিংশ শতাব্দীর শিক্ষার সঠিক জয় এবং সুন্দর পিরামিজ।


উপসংহার:- মাইকেলের কথায় প্রাচীন পণ্ডিতদের গ্রাম বাংলার জননীর কোমল হৃদয় এবং ইংরেজদের উদ্দীপনা বিদ্যাসাগরের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। একজন সঠিক শিক্ষামানসিকতা সম্পন্ন, সুদৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী বিদ্যাসাগর শিক্ষাজীবন কে যেভাবে সমৃদ্ধ ও পরিপুষ্ট করেছেন তা নিয়ে বঞ্চ বঙ্গ মানুষ তাঁকে আশীর্বাদ স্বরূপ লেছেন- "বিদ্যাসাগর বাবা বেঁচে থাকো পাশে।


Read More 

নারী শিক্ষার প্রসারে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা | Vidyasagar in Women's Education in Bengali | Point Bangal

আজ বিদ্যাসাগরের প্রতি যাঁরা শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন তাঁদের অনেকেই "মা কালীর পুজো করে ডাকাতি করার মতলব করছেন"। সেই ডাকাতি আমার আপনার ভাবনার ঘরে ডাকাতি। অতএব সাবধান।

অরূপ ব্যানার্জী

পুরোনো কলকাতার গল্প

ছোট্ট একটা অনুরোধ। লেখাটি যদি ভালো লাগে। তাহলে লিংকটি বন্ধুদের শেয়ার করুন. কারণ এটি শেয়ার করতে আপনার মাত্র এক বা দুই মিনিট সময় লাগবে। তবে এটা আমাদের জন্য উৎসাহ ও সাহস যোগাবে। যার সাহায্যে আমরা আপনাদের জন্য নিয়ে আসব এমন সব নতুন কথা। আর আপনিও লিখতে পারেন আমাদের সাইট - মেইল করুন - thepointbangla@gmail.com
নবীনতর পূর্বতন